জাতিসংঘ সাধারণ সভার আগেই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাজ্য

বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্য জাতিসংঘ সাধারণ সভার আগেই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাজ্য গাজায় ইজরায়েলের তীব্র হামলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনকে একের পর এক দেশ স্বীকৃতি দিতে চেয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এবার একই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য।

গাজায় ইজরায়েলের তীব্র হামলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনকে একের পর এক দেশ স্বীকৃতি দিতে চেয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এবার একই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য।

“ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাস” তৈরির লক্ষ্যে বেলফোর ঘোষণার ১০০ বছরেরও বেশি সময় পর এবং ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠনের ৭৭ বছর পর, যুক্তরাজ্য অবশেষে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার সম্ভবত রবিবারই এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেবেন। এর ঠিক দু’দিন পরেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮০তম অধিবেশন শুরু হতে চলেছে, যেখানে মূল আলোচনার বিষয় হবে দশকের পর দশক ধরে চলা ইজরায়েলি দখলদারিত্ব ও বর্ণবৈষম্য থেকে ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্ব অর্জন।

এই পদক্ষেপটি ব্রিটিশ সরকারের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে একটি বড়সড় পরিবর্তন। এর আগে জুলাই মাসে সরকার জানিয়েছিল, তারা এখনই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে না, বরং একটি উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করবে। তবে এর জন্য কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছিল— যেমন, ইজরায়েলকে গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আলোচনায় বসতে হবে এবং গাজায় কোনরকম বাধা ছাড়া ত্রাণ প্রবেশ করতে দিতে হবে।

কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে গাজার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইজরায়েলি বাহিনী গাজা শহর দখলের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে বোমাবর্ষণ করে চলেছে এবং সেখানকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের ঘরছাড়া করছে।

একই সাথে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইজরায়েলি সেনা ও ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও অভিযান চলছে। ইজরায়েল ক্রমাগত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে নিজেদের সঙ্গে জুড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যার আসল উদ্দেশ্য হলো পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে চিরতরে মুছে দেওয়া।

স্বাভাবিকভাবেই, যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে ইজরায়েল সরকার। তাদের দাবি, এই ধরনের স্বীকৃতি “সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত” করার সামিল। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ৭৫ শতাংশেরও বেশি সদস্য রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

রবিবার ব্রিটেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি অবশ্য জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলেই তা রাতারাতি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যাবে না। তিনি সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, এই স্বীকৃতি আসলে একটি বৃহত্তর শান্তি আলোচনার অংশ, যা বহু বছর ধরে থমকে আছে। বার্তা সংস্থা স্কাই নিউজকে তিনি বলেন, “আমরা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখতেই এই পদক্ষেপ নিতে চাই।”

অন্যদিকে, কনজারভেটিভ দলের নেত্রী কেমি ব্যাডেনক বলেছেন, তিনিও এই অঞ্চলে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান চান, কিন্তু তা ইজরায়েল ও তার প্রধান সমর্থক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেই করা উচিত। ইংরেজি দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফে লেখা এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, এই মুহূর্তে বন্দিদের মুক্তি ছাড়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত করারই নামান্তর।”

গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য সফরে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকে এই স্বীকৃতির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এছাড়া গাজায় আটক ইজরায়েলি বন্দিদের পরিবারের সদস্যরাও সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। শনিবার এক খোলা চিঠিতে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন, যতদিন না তাদের ৪৮ জন পরিজনকে (যাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত বলে মনে করা হয়) ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, ততদিন যেন এই সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়।

যুক্তরাজ্যের এই ঘোষণার ফলে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৪৮। আশা করা হচ্ছে, শীঘ্রই আরও অনেক দেশ এই পথে হাঁটবে। জানা গেছে পর্তুগাল এবং ফ্রান্সও স্বীকৃতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্প্রতি স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়েও গাজায় যুদ্ধের আবহে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত ৬৫,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের পদক্ষেপ চূড়ান্ত হলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একমাত্র স্থায়ী সদস্য, যে ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ।

আগামী সোমবার নিউইয়র্কে ফ্রান্স এবং সৌদি আরব যৌথভাবে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান নিয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করবে। তবে বলাই বাহুল্য যে, যতদিন ফিলিস্তিনের মাটি ইজরায়েলের সামরিক দখলে থাকবে, ততদিন এই স্বীকৃতির বাস্তব প্রভাব সামান্যই এবং এটি মূলত একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হয়েই থাকবে।

আরও খবর