
কিনশাসা: মার্কিন প্রেসিডেন্টের শান্তি স্থাপনের দাবি সত্ত্বেও কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের আশঙ্কা। কঙ্গোর সেনাবাহিনী এবং রুয়ান্ডা-সমর্থিত বিদ্রোহীরা শান্তি চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য পরস্পরকে দায়ী করে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার ফলে এই সংঘাত পুনরায় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বছরের শুরুতে M23 বিদ্রোহী গোষ্ঠী পূর্ব গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের দুটি প্রধান শহর দখল করে নেয়, যা গত দুই দশকে কঙ্গো সরকারের জন্য বড় হুমকি হিসেবে প্রতিপন্ন হয়। এই আক্রমণের জেরে প্রতিবেশী দেশগুলো বিভিন্ন পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ায় একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন ওয়াকিবহল মহল।
এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কাতারের নেতৃত্বে একাধিক শান্তি আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরির আগেই পুরোনো চুক্তির উপর ভিত্তি করে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টার কারণে বর্তমান উদ্যোগগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিদ্রোহীরা আলোচনার অগ্রগতির জন্য তাদের বন্দীদের মুক্তি এবং নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ক্ষমতা ভাগাভাগির দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে, কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স শিসেকেদির সরকার কোনো অঞ্চলের কর্তৃত্ব ছাড়তে বা বন্দী হস্তান্তর করতে নারাজ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স চারজন কঙ্গোলিজ সরকারি ও তিনজন বিদ্রোহী কর্মকর্তা, ছয়জন কূটনীতিক, দুজন প্রাক্তন কর্মকর্তা এবং দুজন কঙ্গো বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলেছে। উভয় পক্ষই জানিয়েছে যে, আলোচনার আবহের মধ্যেই রুয়ান্ডা এবং বুরুন্ডি সীমান্তে অবস্থিত একাধিক শহরে শত শত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, যেখানে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো ওয়াশিংটন ও দোহায় প্রাথমিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে উভয় পক্ষের দ্বারা সংঘটিত শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।
জুন মাসে মার্কিন মধ্যস্থতায় কঙ্গো এবং রুয়ান্ডার মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বিদ্রোহীদের প্রতি রুয়ান্ডার সমর্থন বন্ধ করা। ওয়াশিংটন এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ দিন ধরেই রুয়ান্ডার বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থনের অভিযোগ করে আসছেন। এই ধারাবাহিকতায় কাতার-নেতৃত্বাধীন একটি শান্তি প্রচেষ্টা কিনশাসা এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করলেও, শেষপর্যন্ত তা সফল হয়নি।
অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টফ টিটেকা, যিনি কয়েক দশক ধরে কঙ্গো নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি বলেন, “প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, দুর্বল বাস্তবায়ন এবং গভীর অবিশ্বাস যেকোনো অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।” তিনি আরও বলেন, “এই সবকিছু একটি অন্তহীন দুষ্টচক্রের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে।”
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, এই সংঘাতের অবসান ঘটলে মার্কিন সংস্থাগুলো কঙ্গোর খনিজ সম্পদে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।
M23 বিদ্রোহীরা নিজেদের কঙ্গোর তুতসিদের রক্ষাকর্তা হিসেবে দাবি করে। রুয়ান্ডা বিদ্রোহীদের সমর্থনের কথা অস্বীকার করলেও FDLR-এর হুমকি থেকে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছে। কঙ্গোর অভিযোগ, রুয়ান্ডা কঙ্গোর মূল্যবান খনিজ পদার্থ, যেমন সোনা এবং কোল্টান লুট করার জন্য M23-কে ব্যবহার করছে।
২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত M23 এক দশক পর পুনরায় অস্ত্র হাতে তুলে নেয় এবং জানুয়ারির আক্রমণে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয় এবং জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৭৮ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত। জাতিসংঘের দুটি সূত্র এবং তিনজন কূটনীতিকের মতে, M23-এর উত্তর ও দক্ষিণ কিভু প্রদেশ জুড়ে অন্তত ১৪,০০০ সৈন্য রয়েছে, যার মধ্যে ৯,০০০ নতুন প্রশিক্ষিত সদস্য।
দক্ষিণ কিভুর উভিরার মতো একাধিক শহরে উত্তেজনা বাড়ছে, যেখানে M23, রুয়ান্ডার বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা কঙ্গোর সরকারি সৈন্য, বুরুন্ডির সেনাবাহিনী এবং ‘ওয়াজালেন্দো’ নামক সরকারপন্থী মিলিশিয়াদের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। যেখানে বিশ্বের প্রায় ৬% টিন উৎপাদনকারী খনি অবস্থিত সেই ওয়ালিকালে সরকার কয়েক ডজন বিদেশি সামরিক ঠিকাদার নিয়োগ করেছে বলে জানা গেছে। ট্রাম্পের সমর্থক এবং বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা পরিষেবা প্রদানকারী এরিক প্রিন্স কঙ্গো সরকারের সাথে একটি নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করলেও এখনও কর্মী মোতায়েন করেননি।
