
লাতিন আমেরিকায় মাদকবিরোধী অভিযানের পরিধি বাড়িয়ে এবার ইকুয়েডরে সরাসরি সামরিক তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার মার্কিন ‘সাউদার্ন কমান্ড’ (Southern Command) নিশ্চিত করেছে যে, দেশটিতে ‘চিহ্নিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর’ বিরুদ্ধে ইকুয়েডরীয় বাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে।
অভিযানের প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য
মার্কিন জেনারেল ফ্রান্সিস ডনোভান এক বিবৃতিতে জানান, “৩ মার্চ থেকে ইকুয়েডরে এই অভিযান শুরু হয়েছে। এটি লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে নারকো-সন্ত্রাসবাদের অভিশাপ মোকাবিলায় আমাদের অংশীদারিত্বের একটি শক্তিশালী উদাহরণ।” অভিযানের ভিডিও ফুটেজে সামরিক হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন এবং আকাশপথে নজরদারির চিত্র দেখা গেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে লাতিন আমেরিকার অপরাধী নেটওয়ার্ক এবং ড্রাগ কার্টেলগুলোকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ (Foreign Terrorist Organizations) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছেন। এই অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পন্থা অবলম্বনের সংকেত দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা ও আইনি প্রশ্ন
মার্কিন প্রশাসনের এই আগ্রাসী ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে:
- বেআইনি হত্যাকাণ্ড: মাদক পাচার আন্তর্জাতিক আইনে একটি অপরাধ, কোনো যুদ্ধ নয়। আকাশপথে হামলা চালিয়ে সন্দেহভাজনদের হত্যা করাকে ‘Extrajudicial Killing’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণ্য করছেন অনেকে।
- বেসামরিক প্রাণহানি: ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে এ পর্যন্ত অন্তত ৪৪টি বিমান হামলায় ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের অনেকের পরিবার দাবি করেছে যে তারা সাধারণ মৎস্যজীবী বা দিনমজুর ছিল, মাদক ব্যবসায়ী নয়।
- সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন: এর আগে ভেনিজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার ঘটনাটিকে জাতিসংঘ ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ এবং ‘ভয়াবহ সামরিক আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
ইকুয়েডরের পরিস্থিতি ও প্রেসিডেন্ট নোবোয়ার অবস্থান
এক সময় লাতিন আমেরিকার ‘শান্তির দ্বীপ’ হিসেবে পরিচিত ইকুয়েডরে ২০২০ সালের পর থেকে অপরাধ ও হত্যাকাণ্ড ব্যাপক হারে বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং কলম্বিয়া ও পেরুর মাঝখানে দেশটির কৌশলগত অবস্থানকে দায়ী করা হচ্ছে।
ইকুয়েডরের ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট দানিয়েল নোবোয়া ‘লৌহ হস্ত’ (Iron Fist) নীতিতে বিশ্বাসী। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের এই সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘মাদক পাচার ও অবৈধ খনির বিরুদ্ধে যুদ্ধের নতুন পর্যায়’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর বিরুদ্ধে মাদক দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে সে দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রায়ান ফিনুকেন এই অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, মেক্সিকো এই ধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপের অনুমতি না দিলেও ইকুয়েডর তা দেওয়ায় লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হলো।
