
ভারত মহাসাগর অঞ্চলে নিজেকে ‘নিট সিকিউরিটি প্রোভাইডার’ বা প্রধান নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে দাবি করে আসছে ভারত। কিন্তু গত বুধবার শ্রীলঙ্কা উপকূলে মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো আঘাতে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’ (IRIS Dena) সলিল সমাধি হওয়ায় ভারতের সেই ভাবমূর্তি এখন বড়সড় ধাক্কার মুখে। মাত্র কয়েক মাস আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নৌবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “ভারতীয় নৌবাহিনী হলো ভারত মহাসাগরের অভিভাবক।” কিন্তু সেই ‘অভিভাবক’ নিজের আমন্ত্রিত অতিথিকেই রক্ষা করতে পারল না।
গত সপ্তাহে ভারতের বিশাখাপত্তনমে আয়োজিত দ্বিপাক্ষিক নৌ-মহড়া ‘মিলান’-এ অংশ নিয়েছিল ইরানের এই ৫,০০০ টনের ডেসট্রয়ার। মহড়া শেষে ঘরে ফেরার পথে গত ৪ মার্চ দক্ষিণ শ্রীলঙ্কা থেকে মাত্র ৪৪ নটিক্যাল মাইল দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন সাবমেরিন এটিকে লক্ষ্য করে টর্পেডো ছোঁড়ে। এই ঘটনায় জাহাজটির ৮১ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং শতাধিক নিখোঁজ রয়েছেন। উল্লেখ্য, এই মহড়া চলাকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও ওই জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেছিলেন।
এই হামলার পর ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ভারত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। নৌবাহিনীর বিবৃতিতে কেবল উদ্ধারকাজের কথা বলা হলেও, মার্কিন হামলার কোনো নিন্দা বা সমালোচনা করা হয়নি। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এখানে একটি ‘ক্যাচ-২২’ (Catch-22) বা উভয় সংকটে পড়েছে-
এক, ভারত কি জানত না যে তার বাড়ির পেছনের উঠোনে একটি পারমাণবিক সাবমেরিন ঘুরে বেড়াচ্ছে? দুই, ভারত কি জেনেশুনে তার কৌশলগত অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলাকে নীরব সমর্থন দিয়েছে?
অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ আল জাজিরাকে বলেন, “যদি ভারত এই হামলার বিষয়ে অন্ধকারে থাকে, তবে তা ভারতের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ এবং ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বের’ ওপর বড় প্রশ্ন চিহ্ন।”
ভারতের প্রাক্তন নৌসেনা কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ঘটনাটি ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা স্ট্র্যাটেজিক অটোনমির দাবির ওপর আঘাত। যুদ্ধের ঠিক প্রাক্কালে মোদীর ইসরায়েল সফর এবং খামেনির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী স্তরে কোনো শোকবার্তা না পাঠানো ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত ক্রমশ ইরান থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষের দিকে ঝুঁকছে।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এই পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, “মোদী সরকার ভারতের জাতীয় স্বার্থকে অবহেলা করছে এবং বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা ভারতের পররাষ্ট্র নীতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।” সামরিক ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবন মনে করেন, ভারত অবজেক্টিভলি বা কার্যত এই যুদ্ধে আক্রমণকারীদের (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল) পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।
এই ঘটনায় ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ যে কতটা সীমিত, তা নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “আমেরিকা সমুদ্রের মাঝখানে এই যে নৃশংসতা দেখিয়েছে, তার জন্য তাদের চরম মূল্য দিতে হবে।” ভারত মহাসাগরের তলদেশে শুধু ডেনাই তলিয়ে যায়নি, তার সঙ্গে ভারতের ‘আঞ্চলিক অভিভাবক’ হওয়ার দাবিটিও গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
