
ওয়াশিংটন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য কাজের সুযোগ আরও কঠিন করে তুললেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একটি নতুন নির্দেশিকায় স্বাক্ষর করে তিনি এইচ-১বি ভিসার জন্য সংস্থাগুলির উপর বার্ষিক ১ লক্ষ ডলারের বিপুল ফি চাপিয়েছেন। প্রযুক্তি শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ভিসা ব্যবস্থায় ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ব্যাপক পরিবর্তন আনতে চলেছে।
শুক্রবার এই আদেশে স্বাক্ষর করার পাশাপাশি ট্রাম্প আরও একটি ঘোষণা দেন। তিনি জানান, যারা ১০ লক্ষ ডলার বিনিয়োগ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চান, তাদের জন্য একটি বিশেষ “গোল্ড কার্ড” ভিসা চালু করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “মূল উদ্দেশ্য হলো, সেরা মানুষেরা আমাদের দেশে আসবে এবং তার জন্য তারা অর্থও দেবে।”
এইচ-১বি ভিসার মাধ্যমে মার্কিন সংস্থাগুলি বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার বা কম্পিউটার প্রোগ্রামারের মতো কর্মীদের তাদের প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ দিতে পারে। প্রাথমিকভাবে এই ভিসা তিন বছরের জন্য দেওয়া হলেও, পরে তা ছয় বছর পর্যন্ত বাড়ানো যায়।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ ফি নিশ্চিত করবে যে সংস্থাগুলি শুধুমাত্র সেরা এবং বিরল প্রতিভাদেরই আমেরিকায় আনবে। মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক এই প্রসঙ্গে বলেন, “যদি কাউকে প্রশিক্ষণ দিতেই হয়, তবে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছেলেমেয়েদের দিন। আমেরিকানদের প্রশিক্ষণ দিন। বিদেশ থেকে লোক এনে চাকরি দেওয়া বন্ধ করুন।”
ট্রাম্পের এই ফি ১৯৯০ সাল থেকে চলে আসা এইচ-১বি ভিসা ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। বর্তমানে লটারির মাধ্যমে প্রতি বছর ৮৫,০০০ জনকে এই ভিসা দেওয়া হয়। ট্রাম্প প্রশাসন বরাবরই অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে কঠোর মনোভাব দেখিয়েছে এবং এই নতুন নিয়ম সেই কঠোরতারই প্রতিফলন।
এর আগেও ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছিল।
এইচ-১বি কর্মসূচির সমর্থকরা মনে করেন, এর মাধ্যমে বিশ্বের সেরা প্রতিভারা আমেরিকায় আসেন, যা এই দেশকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখে। অন্যদিকে, সমালোচকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অনেক সংস্থা কম বেতনে কর্মী নিয়োগ করতে এবং শ্রম আইন ফাঁকি দিতে এই ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার করে।
লুটনিকের দাবি, সব বড় বড় কোম্পানিই এই নতুন ফিতে রাজি হয়েছে। তিনি আরও জানান, ভিসার তিন বছরের মেয়াদে প্রতি বছরই ১ লক্ষ ডলার করে দিতে হবে, যদিও এই সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে সংস্থাগুলির খরচ এক ধাক্কায় বহু গুণ বেড়ে যাবে, যা বিশেষ করে ছোট প্রযুক্তি সংস্থা এবং স্টার্ট-আপগুলির কোমর ভেঙে দিতে পারে। মেনলো ভেঞ্চার্সের অংশীদার ডিডি দাস এক্স (X) প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, “এই পদক্ষেপ বিশ্বের সেরা প্রতিভাদের আমেরিকায় আসতে নিরুৎসাহিত করবে।”
অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, সংস্থাগুলি বিপুল খরচের বোঝা এড়াতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি অন্য দেশে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়ে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমেরিকা পিছিয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, এই নতুন ফি-এর আইনি বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের পলিসি ডিরেক্টর অ্যারন রেইখলিন-মেলনিকের মতে, “কংগ্রেস শুধুমাত্র আবেদন খতিয়ে দেখার খরচটুকু নেওয়ার জন্যই সরকারকে ফি ধার্য করার অনুমতি দিয়েছে।”
বর্তমানে ভিসার জন্য লটারিতে নাম তুলতে সামান্য কিছু টাকা লাগে এবং ভিসা মঞ্জুর হলে আরও কয়েক হাজার ডলার খরচ হয়।
এই বছর ১০,০০০-এর বেশি ভিসা পেয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে অ্যামাজনের কর্মীরা। তারপরেই আছে টাটা কনসালটেন্সি, মাইক্রোসফট, অ্যাপল এবং গুগল। রাজ্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি এইচ-১বি কর্মী রয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। গত বছরও এই ভিসা সবচেয়ে বেশি পেয়েছে ভারতীয়রা, প্রায় ৭১ শতাংশ এবং ১১.৭ শতাংশ ভিসা নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল চীন।
